মঙ্গলবার ১৮ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ৪ঠা আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

মোনা লিসা ও তার জনক : পর্ব ০১

তাসনুভা সোমা, লন্ডন   |   মঙ্গলবার, ০৭ মে ২০২৪   |   প্রিন্ট   |   4 বার পঠিত

মোনা লিসা ও তার জনক : পর্ব ০১

চিত্রকর্ম নিয়ে আগ্রহ আছে কিন্তু মোনালিসার নাম শোনেনি এরকম মানুষ বোধহয় এই বিশ্বে নেই। ১৬ শতকে অঙ্কিত মোনালিসা বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সবচেয়ে মূল্যবান চিত্র। সেই মোনালিসা নিয়েই এই লেখা। মোনালিসা কেবল একটি চিত্রকর্মই নয়; এটি একটি রহস্যও বটে। অদ্ভুত এই চিত্রকর্মটি নিয়ে হয়েছে বহু গবেষণা, জানা গেছে অনেক অজানাকে। কিন্তু তারপরও এখনো অজানা রয়ে গেছে অনেক কিছু। মোনালিসা চিত্রকর্মটির জনক লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি এটাও খুব অজানা কোনো তথ্য নয়। তবে অদ্ভুত হচ্ছে মোনালিসা আর মোনালিসার জনক। তারা দুজনেই যথেষ্ট রহস্যময় এবং নানা কারণে বিশেষ। অদ্ভুত এই চরিত্র দুটি সম্পর্কে চলুন কিছু জেনে নেওয়া যাক।

মোনালিসা নাকি মোনা লিসা-ছবিটির প্রকৃত নাম মোনালিসা। কালের বিবর্তনে এটি এখন মোনালিসা নামেই পরিচিত। ইতালীয় ভাষায় মোনা শব্দের অর্থ ম্যাডাম বা ভদ্রমহিলা। সেই বিচারে মোনা লিসা নামের অর্থ হয় ম্যাডাম লিসা। ইতালি আর ফ্রান্সের সাথে মোনালিসার সম্পর্ক ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। সে কারণে এই দুটি দেশের ভাষাতেও এর নাম আছে। ইতালীয় ভাষায় এর নাম La Gioconda এবং ফরাসি ভাষায় La Joconde নামে পরিচিত শিল্পী লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির আঁকা ছবিটি।

লিওনার্দো এর কাজ শুরু করেন ১৫০৩ সালে। এর কাজ চলে ১৫১৯ সাল অবধি। শিল্পী লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি ১৫১৯ সালের ২ মে যখন মৃত্যুবরণ করেন তখনো এর কাজ শেষ হয়নি। কাজেই তিনি ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে পেইন্টিংটির কাজ চালিয়ে যান এবং বেশির ভাগ গবেষকের মতে তার মৃত্যুর সময় এটি অসমাপ্ত ছিল। ২০২৪ সালের শুরুর দিকে এর বাজার মূল্য ছিল ৮৬০-৮৭০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই মূল্য কখনই স্থির না কিংবা নিম্নগামী না। মোনালিসা চিত্রকর্মটির মূল্য ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। যুক্তি দিয়ে বিচার করলে এই পেইন্টিংয়ের মূল্য শত শত বিলিয়ন ডলার। প্রকৃতপক্ষে, এর কোনো মূল্য নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। কেননা, ফরাসি সরকার কিংবা ল্যুভর মিউজিয়াম মোনা লিসা চিত্রকর্মটি কোনো মূল্যেই বিক্রি করবে না। কাজেই এটি একটি অমূল্য চিত্রকর্ম। অসমাপ্ত একটি পেইন্টিং এতটা জনপ্রিয়, এতটা মূল্যবান হওয়ার পেছনে রয়েছে অনেক কারণ। প্রাথমিকভাবে বলা যায় পেইন্টিংটির অনন্য বৈশিষ্ট্য, এর ইতিহাস, কিছু ঘটনা, গবেষণার ফলাফল এবং এটিকে নিয়ে প্রকাশিত নানা থিওরি একে জনপ্রিয় ও মূল্যবান করে তোলে।

মোনা লিসা কেন এত বিখ্যাত- মোনালিসা বিখ্যাত হওয়ার পেছনে আছে নানাবিধ কারণ। কারণগুলো জেনে নেওয়া যাক; মোনালিসা চিত্রটি দর্শকরা যখন কাছ থেকে দেখে, তখন এটি দেখতে একজন সাধারণ নারীর প্রতিকৃতি। বিশ্ববিখ্যাত সব ছবিই সাধারণ, বোধগম্য এবং কোনো একটি কাহিনির বর্ণনা দেয়। মোনালিসার বৈশিষ্ট্য কিছুটা ভিন্ন। এটি প্রথম দৃষ্টিতে সাধারণ মনে হলেও মনোযোগী ও দীর্ঘ দৃষ্টি দর্শকের চোখে বিভ্রম তৈরি করে। মনোযোগ দিয়ে দেখলে যে কেউ বুঝবে এটি কোনো সাধারণ চিত্র না। এই চিত্রে কোনো কাহিনি নেই, আছে শুধু একজন মহিলা। মহিলাটি সম্পর্কে বলতে গেলে কোনো স্পষ্ট ধারণা পাওয়া অসম্ভব। তিনি ধনী, মধ্যবিত্ত কিংবা দরিদ্র হতে পারেন, বিবাহিতা কিংবা অবিবাহিতা হতে পারেন, হতে পারেন সাধারণ কিংবা অসাধারণ কেউ। মোনালিসার পোশাক, অলঙ্কারবিহীন শরীর, আংটিবিহীন আঙ্গুলগুলো নির্দিষ্ট কোনো ধারণা দেয় না। আবার তার মুখের যে হাসি সেটা নিশ্চিত করে না যে তিনি সুখী। বরং তিনি একজন দুঃখী মহিলাও হতে পারেন। তার মুখে স্পষ্ট হয়ে যেন ফুটে উঠেছে এক ধরনের বিষণ্ণতা। এরকম সাধারণ ছবির মধ্যেও এতটা অস্পষ্টতা মানুষকে ভাবিয়ে তোলে। ভিন্নভাবে বলা যেতে পারে লিওনার্দো যেন মোনালিসা সম্পর্কে সবাইকে ভাবার সুযোগ তৈরি করে দিয়ে গেছেন। যে কেউ মোনালিসা সম্পর্কে নিজস্ব একটি ভাবনা ভেবে নিতে পারেন। যার ফলে, মোনালিসা চিত্রটির অর্থ বিবিধ এবং সবার চিন্তার ক্ষেত্র এখানে উন্মুক্ত। যে যেভাবে ভালোবাসে সেভাবেই দেখতে পারে মোনালিসাকে।

মোনালিসার বিশ্বব্যাপী আকর্ষণের আরেকটি অন্যতম জনপ্রিয় কারণ হলো হাসি ও চোখ। দর্শক যখনই মোনালিসার চোখের দিকে তাকায়, মুখ হাসির মতো দেখায়। কিন্তু যখন দর্শকের দৃষ্টি হাসির উপর স্থির হয়, এটি ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যায়। যেন এটি কখনই হাসি ছিল না। তখন আর মনে হয় না যে মোনা লিসা হাসছে। আবার হাসির বিভিন্ন ব্যাখ্যাও আছে, কেউ কেউ মনে করে যে, এটি একটি সুখী হাসি। আবার অনেকে বিশ্বাস করে এটি একটি দুঃখের হাসি। মোনা লিসার ছবি নিয়ে যে বিভ্রান্তি তা কোনো সাধারণ বা ভুল বিষয় না। শিল্পী লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি ছবি আঁকার ক্ষেত্রে কিছু নিজস্ব পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিলেন। সেসব পদ্ধতির মধ্যে একটি ছিল স্ফুমাটো কৌশল। এই কৌশলে ছবি আঁকলে ছবিতে এক ধরনের ধোঁয়াশা তৈরি হয়। আর সেই ধোঁয়াশা দর্শকের চোখে ও মনে বিভ্রান্তির জন্ম দেয়। যাকে বলা হয় অপটিকাল ইলিউশন। তৎকালীন সময়ে শিল্পীদের জন্য রূপরেখা বা লাইন তৈরি করে আঁকা একটি সাধারণ চর্চা ছিল। লিওনার্দো মোনালিসা আঁকার সময় কোনো লাইন বা রূপরেখা ব্যবহার করেননি। বরং তিনি ব্যবহার করেন আরেকটি কৌশল যার নাম কিয়ারস্কুরো (Chiaroscuro), এই কৌশলে একটি চিত্রে আলো ও ছায়ার মিশ্রণে একটি বিশেষ আবহ সৃষ্টি করা হয়। মোনালিসায় তিনি আলো এবং ছায়ার বিভ্রম তৈরি করতে বিভিন্ন রং ব্যবহার করেছিলেন। যেখানে তিনি কাছের বিষয়গুলোকে স্পষ্ট রেখেছে। আর দূরের বিষয়গুলোকে এমনভাবে রেখেছেন যেন তা ধীরে ধীরে অস্পষ্ট হয়ে যায়। দ্য ভিঞ্চির সেই কৌশলের মাধ্যমেই তৈরি হয় মোনালিসার অনন্য হাসি। অপরদিকে মোনালিসার চোখের দিকে খুব মনোযোগ দিয়ে তাকালে একবার মনে হবে সে তার ঠিক সামনের মানুষটির দিকে তাকিয়ে আছে। দীর্ঘ সময় তাকিয়ে থাকলে মনে হতে পারে মোনালিসা দূরের কোনো কিছুর দিকে তাকিয়ে কিছু একটা দেখার চেষ্টা করছে।

মোনালিসাকে ভালবাসার পেছনে অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে এর জনক লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির জনপ্রিয়তা। তিনি ছিলেন ইতালির একজন রেনেসাঁ মানব। অর্থাৎ, রেনেসাঁকে সফল করে তোলার ক্ষেত্রে শিক্ষা, সংস্কৃতি, জ্ঞান ও বিজ্ঞানসহ নানাভাবে তার অবদান ছিল অসামান্য। লিওনার্দো এমন একজন মানুষ ছিলেন যিনি একাধিক ক্ষেত্রে গভীর জ্ঞান বা দক্ষতা অর্জন করেছেন। তার এসব দক্ষতা তাকে এবং তার সৃষ্টিকে এনে দিয়েছে জনপ্রিয়তা ও খ্যাতি। তারপরও কেন শুধু মোনা লিসার জনপ্রিয়তা এত বেশি? এরকম একটি প্রশ্ন থেকেই যায়। কেননা এর সমসাময়িক অনেক ভালো পেইন্টিংও আছে বা ছিল। এমনকি লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির আঁকা আরও অনেক অসাধারণ পেইন্টিং ছিল।

এর উত্তরে বলা যায়, অনেক বিশেষজ্ঞ মোনা লিসাকে রেনেসাঁর একটি অসামান্য প্রতিকৃতি বলে মনে করেন। তাদের মতে লিওনার্দো দা ভিঞ্চির এই চিত্রটির মাধ্যমে একজন আদর্শ রেনেসাঁর চরিত্রকে ফুটিয়ে তুলেছেন। মোনালিসা ধর্মনিরপেক্ষতা, বাস্তববাদ এবং ব্যক্তিবাদ ভিত্তিক রেনেসাঁ আদর্শ দেখায়। যেখানে ধনী, গরিব, ধর্ম-অধর্ম একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয় নয়। বাস্তবেও মোনালিসার পোশাক ও সাজসজ্জা নির্দিষ্ট কোনো কিছুই নির্দেশ করে না। এটি একটি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ চরিত্রের অঙ্কিত রূপ। মোনালিসা হল লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির সর্বোত্তম উদাহরণ যা তার কাজে রেনেসাঁর প্রধান মূল্যবোধ দেখায়। এর সাথে আরও যোগ হয় শিল্পীর সামাজিক অবস্থান। অত্যন্ত প্রতিভাবান লিওনার্দো ছিলেন ফ্রান্সের রাজা প্রথম ফ্রান্সিসের দরবারের একজন সদস্য। রাজা ফ্রান্সিস পরবর্তীতে পেইন্টিংটি কিনেছিলেন এবং লিওনার্দোর মৃত্যুর পর তা প্রদর্শন করা শুরু করেন। এর মাধ্যমে বিশ্বের গণ্যমান্য, জ্ঞানীগুণী মানুষের সান্নিধ্যে আসে লিওনার্দোর চিত্রকর্মটি।

(তথ্যসূত্র ও ছবি : ইন্টারনেট)

Facebook Comments Box

Posted ৬:২৪ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ০৭ মে ২০২৪

londonpratidin.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

Editor : Naem Nizam